Photography
একজন সফল উদ্যোক্তা আকিজ উদ্দিনের জীবনী: জিরো থেকে হিরো হওয়ার গল্প
Posted on 2020-04-28 07:52:45

আপনার যদি কিছুই না থাকে, এবং আপনি যদি তারপরও জীবনে একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, অথবা বিশাল কিছু করতে চান তাহলে আকিজ উদ্দিন হতে পারেন আপনার সেরা অনুপ্রেরণা। অন্য দেশে জ্যাক মা, বা আম্বানি বা স্টিভ জব ছিল আমাদের দেশের গর্ভ ছিলেন একজন আকিজ উদ্দিন। 


আকিজ উদ্দিনের জীবনী:

বিদেশে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের অনেক আগে থেকেই যে চোখে দেখা হয়, আমাদের দেশে একটা সময় পর্যন্ত সেভাবে দেখা হত না। ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁদের গুণীজনের কাতারে রাখা হলেও, আমাদের উপমহাদেশে ব্যবসা করাকে ‘গুণীজনরা’ অনেক সময়েই দ্বিতীয় শ্রেণীর পেশা হিসেবে দেখতেন।

কাজেই শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ – বা এই ধরনের মানুষদের মত ব্যবসায়ীদের জীবন নিয়ে তত ভালো ডকুমেন্টেশন করা হতো না।এখনও যে খুব একটা হয় – তাও বলা যাবে না। এই কারণে, বাইরের ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যতটা সহজ – দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে তথ্য পাওয়া ততটা সহজ নয়। বিশেষ করে যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন – তাঁর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া আসলেই কষ্টকর।

তবে আমাদের সৌভাগ্য শেখ আকিজ উদ্দিন কে নিয়ে বেশ কিছু লেখা, ও তাঁর সাক্ষা‌ৎকার বেশ কিছু পুরাতন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। দৈনিক ইত্তেফাক, বণিক বার্তা, দৈনিক সংবাদ – ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখা পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর নিজের দেয়া সাক্ষা‌ৎকারও বণিকবার্তায় এসেছিল। এর ফলে আমরা মোটামুটি ভালো ভাবেই শেখ আকিজ উদ্দিনের জীবনী ও জিরো থেকে হিরো হওয়ার কাহিনীটি এক জায়গায় করতে পেরেছি।

শেখ আকিজ উদ্দিনের জন্ম ও ছেলেবেলা

১৯২৯ সালে খুলনা জেলার ফুলতলা থানার মধ্যডাঙ্গা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে শেখ আকিজ উদ্দিনের জন্ম। আকিজ, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা শেখ মফিজ উদ্দিন ছোট পরিসরে গ্রামের মৌসুমি ফসল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। কিন্তু সেই স্বল্প উপার্জনে সংসারের নিত্য অভাব দূর হতো না। এই অভাবের সংসারে আকিজের লেখাপড়া করা হয়নি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে দুরন্ত কিশোর আকিজ মাত্র ১৬ টাকা নিয়ে ট্রেনে চেপে কলকাতায় আসেন


স্বপ্ন আর টিঁকে থাকার জন্য আজিজ যুদ্ধ 

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪২ সালে কিশোর আকিজ প্রিয় মধ্যডাঙ্গা গ্রাম ছেড়ে জীবিকার অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন। হাতে মাত্র ১৬ টাকা নিয়ে দুরন্ত কিশোর চেপে বসেন ট্রেনে। অজানা পথের দিকে যেতে যেতে নিরন্তর খুঁজেছেন কোথায় এমন পথ যেখানে অভাব নেই। মানুষের নেই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিংবা চিকিৎসার অভাব। এক পর্যায়ে চলে আসেন কলকাতা। বড় শহর। কোথায় জায়গা মিলবে? কে তাকে আশ্রয় দেবে? শেষ পর্যন্ত আকিজ শেয়ালদহ রেলস্টেশনে তার ঠিকানা খুঁজে নেন। এখানেই অনিশ্চয়তার মধ্যে তার দিন যাপন। একবেলা ছাতু খেয়ে আকিজ কলকাতা শহরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নির্মাণ করেছেন। স্বপ্নের জাল বুনেছেন। কিন্তু তিনি কোনো অবলম্বন পাননি। এভাবেই কেটেছে কিছুদিন। তারপর শিয়ালদহের জাকারিয়া হোটেল মালিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। হোটেলে তার আশ্রয় মেলে। কিশোর আকিজ পাইকারি বাজার থেকে কমলা লেবু কিনে হাওড়া ব্রীজে ফেরি করে বিক্রি করা শুরু করলেন। সকাল সন্ধ্যা কমলা লেবুর ফেরিওয়ালা হয়ে পথে পথে ঘুরেছেন। ক্লান্ত আকিজ রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে কাগজ বিছিয়ে ঘুমিয়েছেন। কিন্তু তার ঘুম আসে না। তিনি কেবল স্বপ্ন বুনতে থাকেন। এরপর আকিজ কমলা লেবুর সামান্য জমানো টাকা দিয়ে একটি অভিনব মুদির দোকান দেন। ভ্যান গাড়ির ওপর সওদা। ভ্রাম্যমান এ দোকানের প্রতিটি দ্রব্যের দাম ছয় আনা। এ কারণে তিনি এ দোকানের নাম রাখেন ‘নিলামওয়ালা ছ’আনা’। 

ভালোই চলছিলো তার দোকান। হঠাৎ একদিন অবৈধ দোকান দেয়ার অভিযোগে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় তিন দিনের জেল পাঁচ টাকা জরিমানা। জেল থেকে মুক্ত হয়ে আকিজ আর দোকানে বসেননি। দোকানটি তিনি বিক্রি করে দেন। ফের অনিশ্চয়তা। এভাবে কিছুদিন কলকাতার পথে পথে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। খড়কুটা আকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করেছেন। একদিন তার পরিচয় হয় পেশোয়ারের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। আকিজ ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে পেশোয়ার যান। অল্প দিনে পশতু ভাষা শিখে ফের অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ফলের ব্যবসা। দুই বছর এ ব্যবসা করে তার লাভ হয় ১০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে আকিজ বাড়ির টানে, বাবা মায়ের স্নেহ মমতার টানে ফিরে আসেন নিজ গ্রাম মধ্যডাঙ্গায়। বাড়ি ফেরার পর অল্পদিনের ব্যবধানে তার বাবা-মা মারা যান। আকিজ ফের নি:সঙ্গ হয়ে পড়েন। তারপরও সকল কষ্ঠবোধ-যন্ত্রণা-শোক থেকে আবার জীবনের দিকে সংগ্রামে পথে। 

আকিজ বিড়ির ব্যবসা শুরু

ব্যবসা আর বড় হওয়ার স্বপ্ন যার ভেতরে একবার জেগেছে – সে সহজে থেমে থাকতে পারে না। আকিজও পারেননি। বাবা-মায়ের মৃত্যুশোক কাটানো ও বিয়ে করার পর তাঁর মাঝের উদ্যোক্তা সত্তাটি আবার জেগে ওঠে। তিনি ভাবতে থাকেন কি করা যায়। তিনি নিজের এলাকায় থেকেই কিছু একটা করতে চাচ্ছিলেন।

সেই সময়ে তাঁর অঞ্চলে বিধু বিড়ি খুব নামকরা ছিল। বিধু বিড়ির মালিক ছিলেন বিধুভূষণ। বিধুভূষণের ছেলে ছিলেন আকিজের কাছের বন্ধু। বিধুভূষণের পরামর্শ ও সহায়তায়ই ১৯৫২ সালে তিনি তাঁর নিজের বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৫২ সালে আকিজ তার বন্ধুর বাবা ‘বিধু’ বিড়ির মালিক বিধু ভূষনের অনুগ্রহ-সহায়তা-পরামর্শে বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসাতে তিনি বেশ সফল হন। বেজেরডাঙ্গা রেল স্টেশনের পাশে তিনি একটি দোকান খুলে বসেন। কিন্তু আগুনে পুড়ে এক রাতে দোকানটি ছাই হয়ে যায়। মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু ধৈর্যশীল আকিজ ফের ঘুরে দাঁড়ান। তিনি স্থানীয় মহাজনদের সহায়তায় আবার দোকান নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে শুরু করেন ধান, পাট, চাল, ডালের ব্যবসা। এক পর্যায়ে ব্যবসার প্রসারের জন্য আকিজ যশোরের নাভারন এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোজাহের বিশ্বাস আকিজকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। আকিজ আর পেছনে ফিরে তাকাননি। নাভারন পুরোনো বাজারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আজকের সবচেয়ে বড় বিড়ি তৈরির কারখানা আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরী।  


১৯৬০ সালে অভয়নগরে প্রতিষ্ঠা করেন এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অত্যাধুনিক একটি চামড়ার কারখানা। তারপর ২০০৬ সালে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একে একে প্রায় ২০টি কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। কোম্পানীগুলোর প্রতিটিই বাংলাদেশ ও দেশের বাইরের বাজারে সুপ্রতিষ্ঠিত।

তাঁর নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করা কোম্পানীগুলোর লিস্টটি দেখলেই ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন:

১. ঢাকা টোবাকো ইন্ডাষ্ট্রিজ (৯৬৬)

২. আকিজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড (১৯৭৪)

৩. আকিজ ট্রান্সপোর্টিং এজেন্সি লিমিটেড (১৯৮০)

৪. জেস ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড (১৯৮৬)

৫. আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি লিমিটেড (১৯৯২)

৬. আকিজ জুট মিল লিমিটেড (১৯৯৪)

৭. আকিজ সিমেন্ট কেম্পানী লিমিটেড, একই বছর আকিজ টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড (১৯৯৫)

৮. আকিজ পার্টিকল বোর্ড মিলস লিমিটেড (১৯৯৬)

৯. আকিজ হাউজিং লিমিটেড (১৯৯৭)

১০. সাভার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (১৯৯৮)

১১. আকিজ ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেড (২০০০)

১২. আকিজ অনলাইন লিমিটেড (২০০০)

১৩. নেবুলা লিমিটেড (২০০০)

১৪. আকিজ কর্পোরেশন লিমিটেড (২০০১)

১৫. আকিজ ইন্সটিটিউট এন্ড টেকনলজি লিমিটেড (২০০১)

১৬. আকিজ অ্যাগ্রো লিমিটেড (২০০৪)

১৭. আকিজ পেপার মিলস্ (২০০৫)

তাঁর অবর্তমানেও তাঁর দেখানো পথে এগিয়ে যাচ্ছে আকিজ গ্রুপ। তাঁর মৃত্যুর পর আকিজ গ্রুপ আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানী খুলেছে এবং ব্যবসা বড় থেকে বড় হয়ে চলেছে।


একজন অনন্য সাধারণ সেখ আকিজ উদ্দিন :


কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদের মালিক হয়েও সেখ আকিজ উদ্দিন খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি নিজের জীবন অভিজ্ঞতার আলোয় তিনি তাদের আলোকিত করেছেন। তার ১৫ সন্তানের মধ্যে ১০ ছেলে ৫ মেয়ে। বড় ছেলে ডা. শেখ মহিউদ্দিন আদ-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক। এছাড়া তার প্রত্যেক সন্তানেরাই সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি তার জীবন যাপনের বাস্তব জ্ঞানে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। তার দুরদর্শিতার কারণেই আজ আকিজ গ্রুপ দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপ হিসেবে দেশে বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। এতকিছুর পরও তার মধ্যে কোনো আত্মঅহমিকাবোধ নেই। তিনি তার বিরুদ্ধের লোকদেরই আপন করে নিতেন। সব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন। মানব কল্যাণে তিনি যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া ছাড়াও ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন হাসপাতাল। 

এছাড়াও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকান্ডে মুক্ত হাতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। ২০০০ সালে যশোরে ভয়াবহ বন্যায় আকিজ ত্রান নিয়ে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন শার্শা-ঝিকরগাছা এলাকায়। এ সময় তিনি নিজে তদারকি করে প্রায় এক কোটি টাকার ত্রান সামগ্রী বিতরন করেছেন। আকিজ উদ্দিনের অন্যতম সৃষ্টি হচ্ছে আদ্ব-দীন ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ট্রাস্ট দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও আরও কিছু জেলায় মানব কল্যাণ, স্বাস্থ্য সেবা ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেছে। এছাড়া তিনি ১৯৮৯ সালে আদ্ব-দীন ওয়েল ফেয়ার সেন্টার, ২০০৪ সালে আদ্ব-দীন ফাউন্ডেশন, ১৯৮০ সালে আদ্ব-দীন শিশু কিশোর নিকেতন, ১৯৮৫ সালে আদ্ব-দীন নার্সিং ইন্সটিটিউট, আদ্ব-দীন ফোরকানিয়া প্রজেক্ট, ১৯৯২ সালে আকিজ কলেজিয়েট স্কুল, ১৯৯৮ সালে সখিনা স্কুল ফর গার্লস প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য বিভিন্ন রকম সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন।


১৬ টাকা থেকে হাজার কোটি টাকা আর কমলা লেবুর ফেরিওয়ালা থেকে ২২টি শিল্প ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের এমডি হয়েছেন সেখ আকিজ উদ্দিন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে পৃথিবীর পাঠশালা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। ৫০ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ করে তিনি লাখ লাখ মানুষের ত্রানকর্তা হয়েছেন।